অলাভজনক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হোপ ফাউন্ডেশনর উদ্যোগে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফ্রি প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারির তৃতীয় ক্যাম্প শুরু হয়েছে। হোপ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র সার্জন ও ফিগো (FIGO) স্বীকৃত অ্যাডভানস লেভেলের ফিস্টুলা সার্জন ডা. নৃন্ময় বিশ্বাসের নেতৃত্বে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতায় হোপ ফিস্টুলা টিম গত ৬ই সেপ্টেম্বর থেকে ৮ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাফল্যের সাথে ফিস্টুলা সার্জারি করেছেন।

এবারের ক্যাম্পের মাধ্যমে সাতজন মহিলা প্রসবজনিত ফিস্টুলা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হচ্ছেন। হোপ ফাউন্ডেশন এর আগেও দুইবার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফ্রি প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ফ্রি প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি সেবা থাকবে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছেন হোপ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিশু ডা. ইফতিখার মাহমুদ।

তিনি বলেন, হোপ ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য হল, অবহেলিত মা এবং শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। সবার সার্বিক সহযোগিতা পেলে আমরা বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফ্রি প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারির ক্যাম্প ভবিষ্যতেও নিয়মিত করব।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. আকবর হোসেন বলেন, হোপ ফাউন্ডেশন আমাদের এখানে প্রসবজনিত ফিস্টুলা সার্জারি করার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানাই। এর মাধ্যমে বরিশাল বিভাগের অনেক রোগী সেবা পাচ্ছেন। পাশাপাশি আমাদের ডাক্তারগণও শিখতে পারছেন। আমরা নিয়মিত ফিস্টুলা সার্জারির ব্যবস্থা করে হোপ ফাউন্ডেশনকে সার্বিক সহযোগিতা করব।

সার্জারির মাধ্যমে সুস্থ হয়ে যাওয়া একজনের নাম চন্দ্রবানু বেগম। বয়স ৬০ বছর। বাস করেন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার পশ্চিম ডুমুরিয়া গ্রামে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় তার। ১৯ বছর বয়সে প্রথম গর্ভবতী হন। প্রথম বাচ্চাটি দাইমা কর্তৃক নিজ বাড়িতে প্রসব হয়। মারা যায় আর তিনিও আক্রান্ত হন প্রসবজনিত ফিস্টুলায়। সেই থেকে দীর্ঘ ৪১ বছর তিনি প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। চন্দ্রবানু নয়টি বাচ্চা প্রসব করলেও মাত্র একজন সন্তান বেঁচে আছেন। বাকি আটজন প্রসবের সময় কিংবা প্রসবের ২/১ মাসের পরেই মারা যায়। তার স্বামী ও একমাত্র সন্তান কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি জীবনে অনেক চিকিৎসা সেবা নিলেও কেউ তাকে এ সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারেননি।

সম্প্রতি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. মো. ফয়সালের সাক্ষাতে আসলে তিনি এই রোগীর প্রসবজনিত ফিস্টুলা শনাক্ত করেন।  হোপ ফাউন্ডেশনের  সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে হোপ ফাউন্ডেশন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার সার্জারির ব্যবস্থা করেন। বর্তমানে চন্দ্রবানু সুস্থ আছেন এবং দীর্ঘ ৪১ বছর পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে অনেক আনন্দিত। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সারা জীবন অনেক কষ্ট করেছি। কেউ ভাল করতে পারেনি। এখন বিধাতার কৃপায় ভাল আছি। আপনাদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ। সারাজীবন আপনাদের জন্য দোয়া করব।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা হল একটি ক্ষত যেটা প্রজনন অঙ্গ এবং মূত্রাশয় এবং/অথবা মলদ্বারের মধ্যে একটা গর্তের সৃষ্টি করে, এর ফলে অনবরত প্রস্রাব/পায়খানা নির্গত হয়। এটা সাধারণত হয় গ্রাম অঞ্চলের দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের। বাঁধাগ্রস্ত বাচ্চা প্রসবের ফলে অনেক সময় প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন স্থানে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রসব পথের বিভিন্ন অংশ পঁচে ফিস্টুলার সৃষ্টি হয়। ফিস্টুলা একটি অত্যন্ত শারীরিকভাবে বেদনাদায়ক, মানসিকভাবে ক্ষতিকর ব্যাধি। অনবরত মূত্র অথবা/এবং মল ঝরার কারণে ফিস্টুলা আক্রান্ত মায়েরা শারীরিকভাবে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে অক্ষম এবং তাদের শরীরে সারাক্ষণ প্রচণ্ড দুর্গন্ধ থাকে। প্রায় সব ক্ষেত্রে তাদের স্বামী তাদের পরিত্যাগ করে, এমনকি উনারা বাবা/মা বা অন্যান্য নিকট আত্মীয়দের কাছেও আশ্রয় পান না। সমাজের প্রত্যেক স্তরেই তারা নিগৃহীত হন।

হোপ ফাউন্ডেশন ২০১০ সালে প্রসবজনিত ফিস্টুলা ফিস্টুলা কার্যক্রমের সূচনা করে। বর্তমানে হোপ ফাউন্ডেশনের প্রসবজনিত ফিস্টুলা কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মায়েদের প্রসবজনিত ফিস্টুলা চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করে যাচ্ছে। হোপ ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগে ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করছে এক দশকের বেশি সময়। গত বছর বরিশাল বিভাগে ফিস্টুলা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছি। বাংলাদেশ সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার  সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করার একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় হোপ ফাউন্ডেশন দেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি কক্সবাজারে একটি ১০০ বেডের নতুন হোপ মেটারনিটি ও ফিস্টুলা হাসপাতালে সেবাপ্রদান শুরু করছে যেখানে ফিস্টুলা সার্জারির পাশাপাশি দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদেরকে ফিস্টুলা অপারেশনের বিশেষায়িত ট্রেনিং প্রদান করা হবে। হোপ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফিস্টুলা সার্জন ডা. নৃন্ময় বিশ্বাস বলেন, হোপ ফাউন্ডেশন কক্সবাজারের পাশাপাশি বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বরিশাল বিভাগের রোগীদের ফিস্টুলা সার্জারির মাধ্যমে সুস্থ করতে পেরে অনেক ভাল লাগছে। যদিও সুদূর কক্সবাজার থেকে এখানে এসে সার্জারি করা অনেক কঠিন কিন্তু সবার সার্বিক সহযোগিতায় সমাজের এই নিগৃহীত মায়েদের সেবা দেয়াই আমাদের ব্রত। আমার ধারণা, বরিশাল বিভাগে ফিস্টুলা আক্রান্ত অনেক মায়েরা আছেন। আমরা এদেরকে চিকিৎসার আওতায় আনার যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

ফিস্টুলা অপারেশন করে ভুক্তভোগী মায়েদের সুস্থ করার পাশাপাশি অবশ্যই প্রতিরোধের দিকেও নজর দিতে হবে। এই লক্ষ্যে মানসম্মত মাতৃত্ব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে সার্বজনীনভাবে। সকল মায়েরা, তারা যেখানেই থাকেন না কেন, একজন দক্ষ মিডওয়াইফ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে সব মেয়েরা গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসবোত্তর সেবা পান। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ মিডওয়াইফ প্রশিক্ষিত করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের কাজের ব্যবস্থা করলেই একমাত্র সার্বজনীন মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০,০০০ রোগী ফিস্টুলায় আক্রান্ত হয়ে আছেন। প্রতিবছর এর সঙ্গে ৮০০ থেকে ১২০০ রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। হোপ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. ইফতিখার মাহমুদ আরও বলেন, আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশ সরকার মাতৃস্বাস্থ্যে অসাধারণ অগ্রগতি সাধন করেছে এবং এই কৃতিত্বের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এখন সরকারি, বেসরকারি সংস্থাসহ সবার সহযোগিতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় দেশের সমস্ত ফিস্টুলা রোগীকে চিকিৎসার আওতায় এনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করা সময়ের দাবি। এজন্য আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে। এ ব্যাপারে হোপ ফাউন্ডেশন সবার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে সর্বদা প্রস্তুত।